কাঁচা পথ, হাঁটুপানি আর সিডর পেরিয়ে শিক্ষার আলো জ্বালানো এক শিক্ষকের ২২ বছর

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভোরের আলো ফুটতেই শুরু হতো পথচলা। সামনে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা। বর্ষাকালে সেই পথের অনেকটাই ডুবে যেত হাঁটুপানিতে। কাদা, পানি, দুর্যোগ কোনো কিছুই থামাতে পারেনি তাঁর পথচলা। গন্তব্য দক্ষিণ ঝাড়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে অপেক্ষা করত ছোট ছোট শিক্ষার্থী, যাদের হাতে তিনি তুলে দিতে চেয়েছেন শিক্ষার আলো।

তিনি মোসাম্মৎ রাহিমা আক্তার। দক্ষিণ ঝাড়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। ২০০৫ সালের ১ জানুয়ারি শিক্ষকতা জীবনে প্রথম যোগদান করেন তিনি। একই বছরের ৩০ আগস্ট যোগ দেন বর্তমান কর্মস্থলে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। প্রায় ২২ বছরের এই কর্মজীবনে তাঁর সঙ্গী হয়েছে অসংখ্য স্মৃতি, সংগ্রাম, আনন্দ, বেদনা, দায়িত্ববোধ আর মানুষের ভালোবাসা।

শিক্ষকতা তাঁর কাছে কখনোই শুধু একটি চাকরি ছিল না। পেশার প্রতি গভীর মূল্যবোধ থেকেই তিনি দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। কর্মজীবনের দীর্ঘ সময়ে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত না থাকার চেষ্টা করেছেন। নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো এবং দায়িত্ব শেষে যথাসময়ে ফিরে যাওয়াকে তিনি বরাবরই গুরুত্ব দিয়েছেন। সহকর্মীরা কে কী করছেন, কে কতটুকু কাজ করছেন এসবের সঙ্গে নিজের কাজের তুলনা না করে নিজের দায়িত্বটুকু যথাযথভাবে পালন করাকেই তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনা ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বরের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডর। সেদিন উপকূলীয় জনপদে নেমে এসেছিল ভয়াবহ বিপর্যয়। যোগাযোগব্যবস্থা ছিল বিপর্যস্ত, নদী পারাপার ছিল কঠিন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তখন শহরে অবস্থান করায় তাঁর পক্ষে বিদ্যালয়ে আসা সম্ভব হয়নি। কিন্তু বিদ্যালয়টি তালাবদ্ধ পড়ে থাকবে—এমনটা মেনে নিতে পারেননি রাহিমা আক্তার। নিজের এক সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে সেদিনও তিনি বিদ্যালয়ে গিয়ে তালা খুলেছিলেন। বিভিন্ন সময়ের বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন তিনি।

তবে তাঁর সবচেয়ে বড় সংগ্রাম ছিল শুধু দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া নয়; ছিল শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহী একটি জনগোষ্ঠীকে বিদ্যালয়মুখী করা। দক্ষিণ ঝাড়াখালী ছিল এমন একটি এলাকা, যেখানে একসময় অনেক অভিভাবক সন্তানের শিক্ষার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন না। তাঁদের অনেকের ধারণা ছিল, সন্তানকে বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দিলেই বাবা-মায়ের দায়িত্ব শেষ। বাড়িতে বসে পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া বা সন্তানকে পড়তে উৎসাহিত করার প্রয়োজনীয়তা অনেকেই অনুভব করতেন না।

২০০৫ সালে রাহিমা আক্তার যখন বিদ্যালয়ে যোগ দেন, তখন সেখানে শিক্ষার্থী ছিল ১৩৫ জন। ২০১০ সালে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে সঙ্গে নিয়ে তিনি ক্যাচমেন্ট এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে যেতে শুরু করেন। অনেক শিশুর বয়স তখন আট-নয় বছর পেরিয়ে গেলেও তারা বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি। নানা অভিযোগ, অনাগ্রহ ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে রাজি ছিলেন না।

রাহিমা আক্তার তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন, শিক্ষার গুরুত্ব বুঝিয়েছেন এবং সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর সেই প্রচেষ্টার ফলও আসে। ২০১০ সালে শুধু প্রথম শ্রেণিতেই ৯৮ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। পরবর্তী দুই বছরে শিক্ষার্থী সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে এবং ২০১২ সালে বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৪৪ জনে।

পরবর্তীতে বিদ্যালয়ের ক্যাচমেন্ট এলাকার মধ্যেই ২০১২ সালে পূর্বদিকে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২০১৫ সালে পশ্চিমদিকে আরও একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে দক্ষিণ ঝাড়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যায়। এর পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রায় ২০০ গজের মধ্যে একটি এবতেদায়ি ও দাখিল মাদ্রাসা থাকায় শিক্ষার্থী ধরে রাখার ক্ষেত্রেও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় বিদ্যালয়টিকে।

তবু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক থেমে থাকেনি। বরং সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছে। তাঁর কাছে পড়াশোনা করা অনেক শিক্ষার্থীর সন্তান যখন আবার একই বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, তখন সেটিকে নিজের কর্মজীবনের একটি বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন তিনি। কারণ এতে তিনি বুঝতে পারেন, একসময় যেসব অভিভাবক শিক্ষার ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিলেন, তাঁদের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে সন্তানের শিক্ষার বিষয়ে সচেতন হয়েছেন।

২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর স্বাভাবিক যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায়। ১৮ মার্চ বিদ্যালয় বন্ধ হওয়ার পরও রাহিমা আক্তার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত রাখার চেষ্টা করেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওয়ার্কশিট বিতরণ করেন। নিয়মিত অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। ফোনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেন।

দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস বিদ্যালয় বন্ধ থাকার পর ২০২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয় পুনরায় চালু হয়। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যেও তাঁর বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে যে যোগাযোগ ধরে রাখা হয়েছিল, সেটি বিদ্যালয় পুনরায় চালুর পর কাজে এসেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের বাইরেও রাহিমা আক্তারের দায়িত্বের পরিধি ছিল বিস্তৃত। নিয়মিত হোম ভিজিট, মা সমাবেশ, ম্যানেজিং কমিটির সভা, উঠান বৈঠক, কাব দল ও হলদে পাখি দল গঠন, স্টুডেন্ট কাউন্সিল নির্বাচনসহ বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। বিদ্যালয় পর্যায় থেকে ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন কার্যক্রমেও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন।

শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেওয়াকেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। ভবিষ্যৎ জীবনে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল একই সঙ্গে স্নেহ, শাসন ও বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা।

এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনেও তাঁকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। বড় সন্তানের জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময় তিনি সন্তানের পাশে থাকতে পারেননি। কারণ তখন বিদ্যালয়ে শিক্ষকস্বল্পতা ছিল। মাত্র দুজন শিক্ষককে দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হতো। ফলে নিজের সন্তানের পরীক্ষার সময় ছুটির জন্য প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদন করার কথাও ভাবতে পারেননি।

ছোট ছেলের সমাপনী পরীক্ষার সময়ও একইভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের পাশের ইউনিয়নে ছয় দিন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে তাঁকে। ব্যক্তিগত প্রয়োজন থাকলেও বিদ্যালয়ের দায়িত্বকে তিনি অবহেলা করেননি।

প্রধান শিক্ষক যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তা যথাসময়ে সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছেন। কোনো কাজ তাঁর কাছে কঠিন মনে হলেও সরাসরি ‘না’ বলেননি। যতটুকু পেরেছেন, যেভাবে পেরেছেন, দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন। সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করেছেন এবং নিজের কাজের মাধ্যমে অন্যদেরও উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছেন।

বিদ্যালয়ের নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি ২০০৮ সাল থেকে ভোটার তথ্য সংগ্রহ ও শিশু জরিপের মতো বিভিন্ন কার্যক্রমেও দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি। বিদ্যালয়ের অনলাইন ও অফলাইনের বিভিন্ন কাজ, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ, শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর, বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিদ্যালয়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সবকিছুতেই তিনি সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে তাঁর কাজের স্বীকৃতিও এসেছে। ২০১৯ সালে ইউনিয়ন পর্যায়ে চূড়ান্ত হয়ে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক নির্বাচিত হন তিনি। ২০২১ সালের ৩০ মে থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। সর্বশেষ ২০২৬ সালে উপজেলা পর্যায়ে গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।

২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর এই বিদ্যালয়ে তাঁর যোগদানের ২০ বছর পূর্ণ হয়। এ উপলক্ষে বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি, পিটিএ কমিটি, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের। দীর্ঘ কর্মজীবনে পাওয়া সেই ভালোবাসা ও সম্মান তাঁকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করেছে।

তবে এত অর্জনের পরও তাঁর চাওয়াটা খুব বড় কিছু নয়। বরং শিক্ষকতার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি রাষ্ট্রের কাছে একটি মৌলিক প্রত্যাশার কথা জানান দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্তসংখ্যক শিক্ষক নিশ্চিত করা হোক।

দুই-তিনজন শিক্ষক দিয়ে বছরের পর বছর একটি বিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। তাই শিক্ষকস্বল্পতার কারণে একজন শিক্ষককে কতটা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়, তা তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর প্রত্যাশা, প্রতিটি বিদ্যালয়ে অন্তত ছয়-সাতজন শিক্ষক থাকলে শিক্ষকরা আরও পরিকল্পিতভাবে শিক্ষার্থীদের সময় দিতে পারবেন এবং বিদ্যালয়ের সামগ্রিক কার্যক্রমও আরও সুন্দরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

দক্ষিণ ঝাড়াখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২২ বছরের পথচলায় রাহিমা আক্তার দেখেছেন সময়ের পরিবর্তন, বিদ্যালয়ের পরিবর্তন, শিক্ষার্থীদের পরিবর্তন এবং অভিভাবকদের সচেতনতার পরিবর্তন। কাঁচা রাস্তা, হাঁটুপানি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সিডরের ভয়াবহতা, বন্যা, করোনা মহামারি কিংবা শিক্ষকস্বল্পতা কোনোটিই তাঁর দায়িত্ববোধকে থামাতে পারেনি।

এই দীর্ঘ পথচলার পেছনে তিনি কৃতজ্ঞ তাঁর পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতি। তাঁদের ভালোবাসা, স্নেহ, সহযোগিতা ও দোয়াকেই নিজের অর্জনের বড় শক্তি মনে করেন তিনি।

দুই দশকের বেশি সময়ের শিক্ষকতা জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর প্রত্যাশা এখনো একই সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে যাওয়া। আগামী দিনগুলোতেও যেন সুস্থ থেকে একইভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই প্রার্থনাই তাঁর।

একজন শিক্ষকের কর্মজীবনের হিসাব হয়তো শুধু কত বছর চাকরি করেছেন, তা দিয়ে করা যায় না। সেই হিসাবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কতজন শিক্ষার্থীর জীবনে তিনি আলো জ্বালিয়েছেন, কতজন অভিভাবককে সচেতন করেছেন, কত প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করেছেন তারও হিসাব। দক্ষিণ ঝাড়াখালীর কাঁচা পথ ধরে মোসাম্মৎ রাহিমা আক্তারের ২২ বছরের পথচলা তাই শুধু একজন শিক্ষকের চাকরিজীবনের গল্প নয়; এটি প্রত্যন্ত জনপদে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক দীর্ঘ, নীরব ও নিরলস প্রচেষ্টার গল্প।

Facebook Comments Box

Leave a Reply

  • Untitled post 14630
  • Untitled post 14225
  • Untitled post 11155
  • Untitled post 14630
  • Untitled post 14225