শিশুর জিম্মা নিয়ে আইনি লড়াইয়ে পিতার জয়, খালার রিভিশন খারিজ

ইসহাক জুয়েলঃ

বরগুনায় তিন বছর চার মাস বয়সী নাবালিকা কন্যার জিম্মা নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধে পিতার পক্ষে নিম্ন আদালতের দেওয়া আদেশ বহাল রেখেছেন জেলা ও দায়রা জজ আদালত। শিশুটির খালার করা ফৌজদারি রিভিশন আবেদন খারিজ করে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) আদালত এ আদেশ দেন।

আদালতের এ সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে নাবালিকা শিশু মোসাঃ রুকাইয়া ইসলাম ইয়ানার পিতার জিম্মায় থাকার বিষয়টি বহাল থাকল।

মামলার নথি ও আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, বরগুনা সদরের বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম রাজনের স্ত্রী মোনালিসা জেরিন ২০২৫ সালের ৬ জুন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার মৃত্যুর পর একমাত্র কন্যা রুকাইয়া ইসলাম ইয়ানার জিম্মা নিয়ে পিতা ও শিশুটির খালার মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়।

শিশুটির খালা সারমিন সুলতানা আসমার দাবি ছিল, জন্মের পর থেকেই শিশুটি তার কাছে লালিত-পালিত হয়ে আসছিল। অন্যদিকে পিতা রাকিবুল ইসলাম রাজন শিশুটিকে জোরপূর্বক নিয়ে গিয়ে অবৈধভাবে আটক করে রেখেছেন, এমন অভিযোগে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেন।

এ অভিযোগে সারমিন সুলতানা আসমা গত ২৭ মে ২০২৬ বরগুনার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১০০ ধারায় একটি মামলা করেন। মামলাটির নম্বর এমপি মামলা নং-৩০২/২০২৬।

আদালতের নির্দেশে পুলিশ গত ৪ জুন শিশুটিকে উদ্ধার করে আদালতে হাজির করে। পরে শিশুটিকে বাদীর জিম্মায় দেওয়া হয় এবং পরবর্তী ধার্য তারিখে আইনানুগ আদেশের জন্য মামলাটি রাখা হয়।

এরপর গত ১৮ জুন উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মামলাটি নথিজাত করে নাবালিকা শিশুটিকে তার পিতা রাকিবুল ইসলাম রাজনের জিম্মায় রাখার নির্দেশ দেন।

নিম্ন আদালতের ওই আদেশের বিরুদ্ধে নারাজি জানিয়ে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ফৌজদারি রিভিশন মামলা করেন সারমিন সুলতানা আসমা। দীর্ঘ শুনানি শেষে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জেলা ও দায়রা জজ আদালত রিভিশনটি খারিজ করে নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন।

শুনানিতে বিবাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম সোহেল আদালতে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, মুসলিম পারিবারিক আইন এবং ১৮৯০ সালের গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস অ্যাক্ট অনুযায়ী পিতা নাবালক সন্তানের স্বাভাবিক ও আইনগত অভিভাবক। পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় এবং সন্তানের হেফাজত তার কাছে থাকলে সেটিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১০০ ধারার আওতায় ‘অন্যায় আটক’ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।

আইনজীবী আরও দাবি করেন, বাদী ও বিবাদীর মৃত স্ত্রীর মধ্যে পূর্ব থেকেই জমিজমা ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা ও বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জের ধরেই শিশুটির জিম্মা নিয়ে মামলাটি করা হয়েছে।

বিবাদীপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুটির দাদি সুস্থ-সবল ও স্নেহপরায়ণ হওয়ায় পিতা ও দাদির যৌথ তত্ত্বাবধানে শিশুটি নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে উঠছে।

আদালতের রায়ের পর সন্তোষ প্রকাশ করে শিশুটির পিতা রাকিবুল ইসলাম রাজন বলেন, আমার স্ত্রী জীবিত থাকাকালীনও তার পরিবারের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল না। জমিজমা নিয়ে তাদের সঙ্গে মামলা-মোকদ্দমাও চলছিল। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে আমি, আমার মা ও বাবা মিলে আমার মেয়েকে লালন-পালন করে আসছি। তাদের সঙ্গেও মেয়ের মাঝে মধ্যে দেখা করার সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু হঠাৎ করে কোরবানির ঈদের পর পুলিশ দিয়ে আমার কাছ থেকে আমার মেয়েকে নিয়ে যাওয়া হয়।

তিনি বলেন,পরে তাদের করা মামলায় আমি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রায় পাই। ওই রায়ের বিরুদ্ধে তারা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন মামলা করেন। দীর্ঘদিন আইনি লড়াইয়ের পর আজ আদালত আমার পক্ষে রায় দিয়েছেন। এতে আমি অত্যন্ত খুশি। আমি মনে করি, আদালতের মাধ্যমে আমি সঠিক বিচার পেয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা, আমার মেয়েকে নিজের কাছে রেখে তার ভবিষ্যৎ সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারব এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।

বিবাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম সোহেল বলেন, আদালতের এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আইনের যথাযথ প্রয়োগ হয়েছে। একই সঙ্গে নাবালিকা শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ ও কল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘদিনের জিম্মা বিরোধে জেলা ও দায়রা জজ আদালতের এ আদেশের ফলে শিশুটির পিতার জিম্মায় থাকার বিষয়টি বহাল রইল।

Facebook Comments Box

Leave a Reply

  • Untitled post 14630
  • Untitled post 14225
  • Untitled post 11155
  • Untitled post 14630
  • Untitled post 14225